
সিরাজুল ইসলাম :দক্ষিণ বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম
কক্সবাজারের বাঁকখালী নদী ঘিরে চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রম রূপ নিয়েছে মামলার ঝড়ে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পঞ্চম দিনে সরকারি কাজে বাধা ও হামলার ঘটনায় নতুন করে দায়ের হলো আরও একটি মামলা। এতে ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা এক হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। ফলে গত কয়েক দিনে দায়ের হওয়া তিনটি মামলায় আসামির সংখ্যা দাঁড়ালো ১ হাজার ৬৫০।
রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিআইডব্লিউটিএর পোর্ট অফিসার মো. আব্দুল ওয়াকিল বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। সদর থানার ওসি মো. ইলিয়াস খান জানান, মামলায় জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মনির উদ্দিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী ও ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার প্রভাবশালীদের নামও রয়েছে এজাহারে।
গত শুক্রবার সকাল থেকেই নুনিয়ারছড়া ও নতুন বাহারছড়া এলাকায় বুলডোজার নিয়ে উচ্ছেদে নামে প্রশাসন। সঙ্গে ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, র্যাব ও সেনা সদস্যরা। কিন্তু মূল অভিযানের আগেই শহরের প্রধান সড়ক ও বিমানবন্দর সড়কে নেমে আসে শত শত স্থানীয় জনতা। তারা ব্যারিকেড দেয়, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে এবং ঠেলাগাড়ি ফেলে বিমানবন্দর সড়ক অবরুদ্ধ করে। এসময় বুলডোজার ভাঙচুর ও কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে।
বাঁকখালী নদী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপন্ন হয়ে কক্সবাজার শহরের কস্তুরাঘাট হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদীর নুনিয়ারছড়া থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার এলাকায় সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে। স্থানীয় ভূমি অফিস ও বিআইডব্লিউটিএর পৃথক তালিকায় প্রায় সাড়ে ৩০০ প্রভাবশালী দখলদারের নাম উঠে এসেছে। অথচ প্রকৃত অবৈধ দখলদারদের সংখ্যা সহস্রাধিক।
২০১০ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনে বাঁকখালী নদীবন্দরের সংরক্ষক হিসেবে বিআইডব্লিউটিএকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে না দেওয়ায় কার্যত নদী দখল চলে আসছিল
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে যৌথ অভিযানে ৬ শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রায় ৩০০ একর জমি উদ্ধার করেছিল জেলা প্রশাসন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে দখলদাররা ফের প্যারাভূমিতে স্থাপনা গড়ে তোলে। বর্তমানে সেখানে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা আবারও দাঁড়িয়ে গেছে।
গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট এক রায়ে বাঁকখালী নদীর আরএস জরিপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন ও চার মাসের মধ্যে উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেয়। সেই আদেশ বাস্তবায়নে ৩০ আগস্ট কক্সবাজারে বিশেষ সমন্বয় সভায় নৌপরিবহন উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ঘোষণা দেন, “যৌথ তালিকার ভিত্তিতে দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।”
এরপর ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। প্রথম দুই দিনে চার শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করে ৫৬ একর জমি উদ্ধারের তথ্য দেয় বিআইডব্লিউটিএ।
তবে মূল প্রশ্ন এখন—এত মামলা ও উচ্ছেদের পরও কতদিন টিকে থাকবে দখলমুক্ত বাঁকখালী? স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পুনর্দখলের প্রবণতা বন্ধ করতে প্রশাসনের ধারাবাহিক নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে নদীটির ভবিষ্যৎ।
