চরবাসীর স্বপ্ন পূরণ, একটি ব্রিজ পেয়েই হাজার হাজার চরবাসীর মুখে তৃপ্তির হাসি

Spread the love

রেজাউল করিম
গোয়ালন্দ(রাজবাড়ী) প্রতিনিধি 

আমাগো কষ্ট দেহনের কেউ নাই। জীবনডা কষ্ট করেই পার করলাম। বেশ আক্ষেপ ও চাপা কষ্ট নিয়ে প্রায় বছর দুয়েক আগে কথাগুলো বলেছিলেন মাঝি সুজন শেখসহ মজলিশপুর চরাঞ্চলের মানুষ।

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউপির ৯ নং ওয়ার্ডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত প্রত‍্যন্ত দুর্গম চরাঞ্চল মজলিশপুর ও মহিদাপুর যাত্রী পারাপারে পদ্মার মাঝি সুজন শেখ, স্থানীয় বাসিন্দা শাজাহান শেখ, জহিরুল শেখ, মালেক বেপারী ও ৩১ নম্বর মজলিশপুর জয়নাল মৃধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী শিক্ষক জহির রায়হানসহ অনেকেই খুব কষ্ট নিয়ে বলেছিলেন কথাগুলো। বছরের প্রায় ছমাস পানিতে ভরে থাকে মজলিশপুর ও মহিদাপুর গ্রামটি। সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। তবে অনেকেই আবার নানান পেশার সাথে জড়িত। কেউ পদ্মার বুকে মাছ ধরেই সংসার চালান। শহরের সাথে তেমন ভালো যোগাযোগের ব‍্যবস্থা নেই গ্রামটির। রাস্তা-ঘাটের বেহাল দশা। এঅঞ্চলের কৃষিপণ‍্য আনা-নেয়ার একমাত্র মাধ‍্যম ছিল ঘোড়ার গাড়ি। উপজেলা শহর থেকে প্রায় ৫-৭ কিলোপথ চিপা রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করতে হয় এলাকার প্রায় ৮-১০ হাজার মানুষের। শুকনা মৌসুমে ওই রাস্তায় কম-বেশি ভ‍্যান-রিক্সা চলাচল করে। বর্ষা মৌসুমে ওই রাস্তা দিয়ে ভ‍্যান-রিক্সা চলাচল তো দূরের কথা ঘোড়ার গাড়ী চলাচলে বড়ই মুশকিল হয়ে পরতো। সবচেয়ে বড় অসুবিধায় পরতে হয় বর্ষা মৌসুমে। তখন ওই চিপা রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে হাঁটায় মুশকিল। শহরের সাথে একমাত্র যোগাযোগের জন‍্য যে রাস্তাটা রয়েছে সেখানে একটা জায়গায় প্রায় হাফ কিলোমিটার রাস্তা নিচু থাকায় বর্ষা মৌসুমে ওই রাস্তা দিয়ে পারাপারের একমাত্র মাধ‍্যম ছিল নৌকা। তবে এবার ব্রিজ নির্মাণ হ‌ওয়ায় কষ্ট লাঘব হয়েছে চরবাসীর।

এলাকার বেশ কয়েকজন লোকের সাথে কথা হয়। তারা মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলেন, বছর দুয়েক আগেও বর্ষা মৌসুমে আমাদের অনেক কষ্ট করে নদী পার হ‌ওয়া লাগতো। প্রায় দেড়কিলোমিটার রাস্তা বছরের প্রায় অর্ধেক মাস পানিতে ভরে থাকে। ফসল আনা-নেয়ায় নৌকা ছাড়া উপায় ছিলো না। এই হাফ কিলোমিটার জায়গায় চলাচলের জন্য সুন্দর একটি ব্রিজ করেছে সরকার। আমরা এখন খুব খুশি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মজলিশপুর ও মহিদাপুর গ্রামে প্রবেশ করতে হাফ কিলোমিটার রাস্তায় চ‌ওড়া একটা ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। আগে সেখান দিয়ে যাতায়াত করতে নৌকা ব‍্যবহার করা হতো। ওই এলাকায় কোমলমতি শিশুদের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পাড়াপাড় হতে হতো। ভরা বর্ষায় অতিরিক্ত স্রোত থাকতো সেখানে। ব্রিজ হ‌ওয়ায় এখন আর ভোগান্তি পোহাতে হয় না। শিশুদের শিক্ষা দানের জন‍্য মজলিশপুর চরে ৩১ নম্বর মজলিশপুর জয়নাল মৃধা সরকারি প্রাথমিক বিদ‍্যালয় নামে একটি স্কুল রয়েছে। সেখানে প্রায় দুই’শ জনের মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সখানেক শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়েই নৌকায় পারাপার হতে হতো। ভরা বর্ষা মৌসুমে সেখানে প্রখর স্রোত থাকায় অনেক সময় বিপদে পরতে হতো সেসকল শিক্ষার্থীদের। ব্রিজ হ‌ওয়াতে এখন আর কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয় না শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসীর।

এসম্পর্কে স্থানীয় চর দৌলতদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ‍্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, মজলিশপুর চরে ব্রিজের এপার-ওপার দিয়ে প্রায় ৮/৯ শত পরিবারের বসবাস। নদীর এপার-ওপার দিয়ে প্রায় দশ হাজার মানুষ, স্কুলের কোমলমতি শিশুদের ঝুঁকি নিয়েই এই নদী পার হতে হতো। তিনি আরও বলেন, ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনাময় চর এটি। এ চরে মৌসুমীভিত্তিক সব ধরণের ফসল খুব ভালোই উৎপাদন হয় কিন্তু যাতায়াতের ব‍্যবস্থা ভালো না থাকায় এখানকার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক দাম পেত না। নৌকায় ফসল আনা-নেয়ায় অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো এ অঞ্চলের মানুষদের। ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনাময় এ চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন‍্য হাফ কিলোমিটার একটা ব্রিজ খুবই জরুরি ছিল। এর আগে ব্রিজের জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হ‌ওয়ার পরে ব্রিজটি নির্মাণ করেন সরকার। এখন কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই খুব সহজে এলাকার মানুষ চলাচল করতে পারছে।

উজানচর ইউপির ৯ নং ওয়ার্ড সদস্য শেখ রাসেল আহমেদ জানান, এঅঞ্চলের মানুষের নদীর সাথে যুদ্ধ করেই চলতে হয়। মজলিশপুর চরে যাওয়ার আগে কোনো রাস্তায় ছিলো না। বছর ৩/৪ আগে চরবাসীর চলাচলের জন্য মাটির তৈরি রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তবে মজলিশপুর ও মহিদাপুর চরে চলাচলের জন‍্য হাফ কিলো রাস্তা বছরের প্রায় ৮/১০ মাস পানিতে তলিয়ে থাকে। তখন নৌকা ছিল একমাত্র ভরসা। একটা ব্রিজের জন্য স্থানীয় প্রশাসন বরাবর বরাদ্দ চাওয়ায় সেখানে এখন অনেক টাকা ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। এখন চরাঞ্চলের মানুষ রিক্সা, ভ্যান, অটো এমনকি বড় বড় যানবাহনে তাদের কৃষি পন্য খুব সহজেই আনা নেয়া করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *